ভালোবাসি যে তোমায় – ইসরাত জাহান ইকরা । পার্ট: 12

বিনোদন

ভালোবাসি যে তোমায়

– ইসরাত জাহান ইকরা

সন্ধ্যার আগেই অনুষ্টান শেষ হয়ে গেল। তাই সব গেস্টরা যে যার বাসায় চলে গেল। সারাদিন অনেক ধকল গেছে সবার উপর দিয়ে তাই ক্লান্ত থাকায় সবাই সবার ঘরের উদ্দেশ্য গেল ফ্রেস হোওয়ার জন্য। আস্তে আস্তে সবাই ড্রয়িং রুমে আড্ডার আসর জমিয়ে ফেলেছে। মিষ্টি খাবার টেবিলে জেঠিমার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে আর হাতে হাতে কাজ করে দিচ্ছে । শুভ্র মিষ্টির দিকে পলকহীন ভাবে তাকিয়ে আছে। এবং মুচকি মুচকি হাসছে। তখনি আরমান চৌধুরী বলে উঠলো রাত তো কম হয়নি চলো এবার ডিনার করা যাক। তারপর সবাই খাবার টেবিলে চেয়ার টেনে বসলো। তখনি আশা চৌধুরী বলে উঠলো।‌
আশা চৌধুরী: কিরে মিষ্টি,,, ইকরা ক‌ই রে?
মিষ্টি: ঘরে বসে আছে হয়তো। আমি আসতে বললাম তখন তো বললো পরে আসবে ক‌ই এখনো তো আসার কোন নাম গন্ধ দেখছি না।
আশা চৌধুরী: বুঝেছি রাগ করে আছে । আর রাগ করাই তো স্বাভাবিক। ইকরার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে ও তো একি কাজ করতো।( তখনি রুদ্র বলে উঠলো)
রুদ্র: আমি ইক………( বলতে গিয়ে ও বললো না) না মানে আমি একটু আমার রুম‌ থেকে আসি। {এই বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে গেল)
এইদিকে………..
রুদ্র ইকরার রুমে এসেই আস্তে আস্তে দরজাটা লক করে দিল। ইকরা কারো উপস্থিতি টের পেয়ে ধরফরিয়ে উঠে বসলো। তখনি দেখলো রুদ্র দরজা লক করছে।
ইকরা: তুই….. এখানে কেন এসেছিস ( রেগে)
রুদ্র: ইকরা আমি জানি আমি ক্ষমার অযোগ্য। তারপরেও তর কাছে আমি ক্ষমা চাইতে আসলাম।ইকরা সত্যি বলছি I’m really sorry।
ইকরা: তকে বলেছি আমার কাছে এসে সরি ফরি বলতে। আমি তকে চিনি না এটাই সবচেয়ে বড় কথা। আর ইশা কোথায় ওর কাছে যা। দয়া করে আমার সামনে আর আসবি না।
রুদ্র: আরে বাপ শুন তো আগে আমার কথা টা,,,,,,
ইকরা: ব্যাস সকাল থেকে অনেক শুনেছি। আর আমি কিছুই শুনতে চাই না। আজকে তর জন্য আমার আব্বু আমার গায়ে হাত তোলেছে। তর জন্য আজকে আমি সবার সামনে অপমানিত হয়েছি। ( অনেক জোরেই বললো কথা টা)
রুদ্র: আম্মুকে এভাবে মেঝেতে পরে থাকতে দেখে আমার মাথা ঠিক ছিল না বিশ্বাস কর। মানুষ মাত্রই ভুল তেমনি আমিও ভুল করে ফেলেছি। এই শেষবারের মতো মাফ করে দে। একটাই তো মাত্র চর দেয়েছি।
ইকরা: কিহ একটা চর দিয়ে আবার বলছিস। আমি তকে হিসাব দেই আমি কয়টা চর খেয়েছি। প্রথম চর টা তুই দিয়েছিস দ্বিতীয় টা আব্বু দিয়েছে। তারপর আবার তুই চর দিতে গিয়েছিলি । জেঠি তকে থামিয়ে দিয়েছিল ( এসব বলছিল আর হাত দিয়ে গুনছিলো)
রুদ্র: এইসবটাই তো দিশা আপুর জন্য হয়েছিল। এক কাজ করি চল। আজকে দিশা আপুকে লেঙ মেরে মেঝেতে ফেলে দিই। কি বলিস ( মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো)
ইকরা: থাক এসব আর কিছু করতে হবে না। সাথে সাথে যদি মাফ চাইতি তাহলে একবার ভেবে দেখতাম। ( মন খারাপ করে)
রুদ্র: শুন না ইকু। তর জন্য আজ আমি কিছুই খাইনি। প্লীজ এইবারের মত মাফ করে দে না । তুই জানিস কেউ যদি ভুল করে তাকে যদি সেই ব্যাক্তিটি মাফ করে দেই। তাহলে এটা তার মহত্ত্বের পরিচয় ।
ইকরা: তুই কি মিথ্যেক রে বাবা। আজ বিকেলে ও না ইচ্ছে মতো গিলেছিস। আর তুই জানিস আমি এতোটা ও ভালো না। যাই হোক এখন যদি ১০০ বার কান ধরে উঠবস করিস তাহলে মাফ করতে পারি। ( ভেঙছি কেটে)
রুদ্র বাধ্য ছেলের মত ৫০ বার উঠবস করতেই ইকরা বলে উঠলো হয়েছে হয়েছে এইবার মাফ করলাম। আর যাতে এইরকম ভুল না হয়। ( কিছু টা ভাব নিয়ে)
তখনি রুদ্র বলে উঠলো….
রুদ্র: তুই কত ভালো ইকু। দেখি কোন গালে চর দিয়েছিলাম ( এই বলে রুদ্র যেই গালে চর দিয়েছিল সেখানে টুক করে একটা চুমু দিয়ে দিল)
ইকরা কিছু বলতে নিবে তখনি হুরমুড়িয়ে বাড়ির সকলে উপস্থিত। এতক্ষণ ধরে সবাই সবটাই দেখছিল আর মুখ চেপে হাসছিল। যখন রুদ্র ইকরা কে কিস করলো তখনি আর কেউ হাসি চাপিয়ে রাখতে পারলো না। দিশা লেঙ মারার কথা শুনে রেগে সেখান থেকে চলে গিয়েছিল সাথে ইশা ও। সবাই ভিতরে ঢুকেই পেট চেপে হাসা শুরু করে দিল। আশা চৌধুরী হাসতে হাসতে বলে উঠলো কিরে রুদ্র তুই নাকি তর রুমে যাবি। এখানে এসে এসব করা হচ্ছে। তখন শুভ্র বলে উঠলো। রুদ্র তুই ছিটকিনি টা ভালো করে লাগাতে পারলি না গাধা। তখন মিষ্টি বললো ইকরা বেচারা কে এবার মাফ করেই দে ( হাসতে হাসতে) এবার আরমান চৌধুরী বলে উঠলো। এরা এখনো ছেলে মানুষি রয়ে গেল। আর রোদ বেচেরা,, রুদ্র ইকরা কে কিস করতে দেখে মুড অফ করে রেখেছে না পারছে বলতে না পারছে স‌ইতে।
এভাবেই ওরা রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে যে যার রুমে ঘুমাতে গেল। খাবার টেবিলে মিষ্টি শুভ্র কে মেসেজ করে বলেছিল রাত ১০ টায় ছাদে অপেক্ষা করতে। আজ মিষ্টি ঠিক করে রেখেছিল আজ শুভ্র কে তার সব মনের কথা বলে দিবে যেই ভাবা সেই কাজ।
ঠিক রাত ১০ টা…………..
মিষ্টি ছাদে উঠার সিঁড়ি যে যেই পা দিবে ওমনি দিশা আর ইশা এসে হাজির।
দিশা: এতো রাতে কোথায় যাচ্ছো ( রেগে )
মিষ্টি: আ আসলে পা পানি আনতে নিচে যাচ্ছিলাম। ( তুতলিয়ে)
ইশা: পানি আনতে উপরে কি। আমাদের তোমার কি বোকা মনে হয়।
দিশা: তোমার দিন দিন সাহস বেড়েই চলেছে কিছু বলতে না বলতে। শুভ্র সাথে দেখা করতে ছাদে যাচ্ছো মনে করেছো আমি কিছুই জানি না। শুভ্রর আগে আমিই তোমার মেসেজ টা পরেছিলাম।
মিষ্টি: জেনেই যখন গিয়েছেন তাহলে জিগ্যেস করার কি আছে। হ্যা আমি শুভ্রর সাথেই দেখা করতে যাচ্ছি। তোমাদের কোন সমস্যা।
ইশা; বাব্বাহ শুভ্র ভাই থেকে এখন শুভ্র হয়ে গেল।
দিশা: বুঝতে পারছিস না ইশা এদের চরিত্রের সমস্যা আছে। হ্যান্ডসাম সুন্দর ছেলে দেখলেই এরা মাঝরাতে দেখা করতে যায়।
মিষ্টি: দিশা আপু মুখ সামলে কথা বলুন। আপনি আমার চরিত্র সম্পর্কে কতটুকু জানেন। যে এতো বড় বড় কথা বলছেন।
তখনি দিশা মিষ্টির চুলের মুঠি ধরে বললো। চল আজ বাড়ির সবার সামনে তর চরিত্র সম্পর্কে বলছি। তুই আমার আর শুভ্রর মাঝে কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছিস। যতক্ষণ আংকেল আংটি কে তর এই নোংরামির কথা না বলছি আমার ততক্ষন শান্তি নেই। বলবো নাকি তর জেঠা জেঠি কে।
মিষ্টি: না দিশা আপু এটা করো না প্লীজ। আমি জেঠুর মনে কষ্ট দিতে পারবো না। তুমি যা বলবে আমি তাই করবো। ( কান্না করতে করতে)
তারপর দিশা শয়তানি হাসি দিয়ে বললো। সত্যি তো আমি যা বলি তা তুই করবি। বিনিময়ে মিষ্টি মাথা নাড়ালো।
দিশা: তাহলে শুন। এখনি তুই শুভ্র কে গিয়ে বলবি তুই শুভ্রকে ভালোবাসিস না। সবসময় শুভ্রকে ইগনোর করে চলবি। আর আমি যে তকে এসব বলেছি কোন কাক পক্ষি যাতে টের না পায়। আমি কিন্তু সবদিক দিয়ে নজর রাখবো। চল ইশা ( এই বলে ওরা চলে গেল)
মিষ্টি এখানেই দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো। মিষ্টি চোখ মুছে ছাদের দিকে রওনা দিল।
ছাদে………..
শুভ্র মিষ্টিকে আসতে দেখতে পেয়েই জিগ্যেস করলো…
শুভ্র: এতোক্ষণ ধরে কি করছিলি । এটুকু আসতে এতো সময় লাগে। তখনি দেখলো মিষ্টি মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের কোনে জল চিকচিক করছে চাঁদের আলোতে তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
তারপর শুভ্র মিষ্টির দুই গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো । কি হলো কোন কারনে মন খারাপ।
মিষ্টি শুভ্রর থেকে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে উঠলো।
মিষ্টি: আমাকে ছোঁবেন না শুভ্র ভাই। আমার থেকে আপনি দূরে থাকুন আমার কাছে আসার চেষ্টা করবেন না ।
শুভ্র মিষ্টির কথা শুনে ফিক করে হেসে দিল।
শুভ্র: আমাকে ১ ঘন্টা ধরে দাঁড় করিয়ে মশার কামড় খাইয়ে মজা করা হচ্ছে। দাঁড়া দেখাচ্ছি তকে দুষ্টু। এই বলে এগুতে নিলে মিষ্টি বলে উঠলো।
মিষ্টি: আর এক পা এগুতে নিলে আমি কিন্তু ছাদ থেকে লাফ দিব শুভ্র ভাই।( হেঁচকি তুলে)
শুভ্র এবার সিরিয়াস হলো। তারপর শুভ্র মিষ্টি কে এক টানে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে বলতে লাগলো।
শুভ্র: এসব কথা বলে না পাগলি। তর মুখে যাতে এই কথা আর দ্বিতীয়ত বার না শুনি। এই বলে শুভ্র মিষ্টির থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়িয়ে বললো বল এবার কি বলবি।
মিষ্টি: আমি আপনাকে ভালোবাসি না শুভ্র ভাই। এবার আশা করছি আমি আমার থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকবেন।
শুভ্র কপাল কুঁচকে বললো এসব তকে কে শিখিয়ে দিয়েছে বল। আমি জানি এটা তর মনের কথা না।
মিষ্টি: আপনি কিচ্ছু জানেন না। আমি আপনাকে ভালোবাসি না ভালোবাসি না। শুনেছেন।
শুভ্র: আমি তর চোখের ভাষা বুঝি মিষ্টি। তুই কোন কিছুতে ভয় পাস না। আমাকে একবার বল কে তকে এসব শিখিয়ে দিয়েছে।( হাত মুষ্টিবদ্ধ করে)
মিষ্টি: কেউ কিছুই শিখিয়ে দেই নি ( আরালে চোখের জল মুছলো)
শুভ্র: যদি নাই ভালোবাসিস তাহলে আড়ালে কাঁদছিলি কেন। আমার চোখে চোখ রেখে বল তুই আমাকে ভালোবাসিস না। তাহলে আমি তকে আর কোনদিন ডিস্টার্ব করবো না।
তারপর মিষ্টি শুভ্রর চোখে চোখ রেখে বলে উঠলো আমি আপনাকে ভালোবাসি না। এই বলে যেই চলে যেতে নিবে ওমনি শুভ্র মিষ্টির হাত ধরে ফেলে।
শুভ্র; আমার কথা না শুনেই পালাচ্ছিস কেন। তুই কি ভেবেছিস তুই বললেই আমি বিশ্বাস করবো । তবে শুনে রাখ তুই এই শুভ্রর ছাড়া আর কারো না। আর আমি যখন বলেছি তকে ডিস্টার্ব করবো না তবে কালকেই আমি অস্ট্রেলিয়া ফিরে যাবো। তখন তুই আমায় নিজের ইচ্ছায় ভালোবাসার কথা বলবি। সবশেষে এটুকুই বলবো,,,,, তকে আর বলবো না ভালোবাসি. করবো না জোর. চাইলে ফিরে আসিস জায়গাটা শুধুই তর। এই বলে শুভ্র সেখান থেকে চলে গেল। আজ প্রথম শুভ্রর চোখের পানি দেখতে পেলো মিষ্টি।
মিষ্টি ছাদে আর এক মূহুর্ত না দাঁড়িয়ে দৌড়ে ঘরে চলে গেল। ঘরে গিয়ে মেঝেতে বসে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো যে চিৎকার চার দেওয়ালের মাঝেই আটকে রয়লো।
চলবে 💕💕………

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *